Menu
Menu

সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রবন্ধ রচনা PDF

ভালো লাগলে শেয়ার করো

বিভিন্ন ব্যাক্তিত্বের জীবনী বিষয়ক প্রবন্ধ রচনা লেখার মূল উদ্দেশ্য আমরা ছাত্রছাত্রীরা সেইসব মনীষীদের জীবনের নানা উত্থান পতনের কাহিনিকে কতখানি জেনেছি, তাঁদের আদর্শকে কতখানি আত্মীকরণ আমরা করতে পারি। তাঁদের জীবনের নানা কথা আমাদের যেমন চমকিত করে তেমনি আমরা বিস্মিত হই তাঁদের আত্মপ্রত্যয়ী মনোভাবের উজ্জ্বলতায়। ছাত্রছাত্রীরা মনীষীদের জীবনের আদর্শ-বীরত্ব, তাঁদের রচিত গ্রন্থাবলী, সমাজে তাঁদের প্রভাব প্রভৃতি বিষয়ে অধ্যয়ন করে তা সাজিয়ে লিখবে। sahajbanglarachana.com

সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রবন্ধ রচনা PDF

উপক্রমণিকা

বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল প্রতিভা, ধ্রুপদী জীবনের এক মহৎ দরদি রূপকার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। রবীন্দ্র পরবর্তীকালে কথাসাহিত্যের আঙিনায় যে তিন জন বন্দ্যোপাধ্যায় শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার হয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন বিভূতিভূষণ তাঁদের অন্যতম। অন্য দুজন ছিলেন তারাশঙ্কর ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। কথাসাহিত্যের সাহিত্য-ভাষা যে কত প্রাণবস্ত হয়ে উঠতে পারে বিভূতিভূষণ পাঠ না করলে তা হয়তো সেই সময়ের প্রেক্ষিতে অজানাই থেকে যাবে। তাঁর রচনায় চলমান মানবজীবনের পাঁচালি জীবন্ত ও মর্মস্পর্শী হয়ে উঠেছে যেমন তেমনই প্রকৃতি জীবনের অপরিহার্য অঙ্গরূপে অঙ্গীকৃত হয়েছে।

প্রথামিক পরিচয়

১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দের ১২ সেপ্টেম্বর (২৮শে ভাদ্র, ১৩০১) বর্তমান উত্তর ২৪ পরগনার (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত) কাঁচড়াপাড়ার কাছে মুরাতিপুকুর গ্রামে মামার বাড়িতে বিভূতিভূষণের জন্ম। পিতা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়, মাতা মৃণালিনী দেবী। সুকণ্ঠের অধিকারী মহানন্দ ছিলেন সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে পণ্ডিত। কথকতাও করতেন। বিভূতিভূষণের স্বগ্রাম ছিল বনগ্রাম মহাকুমার চালকী-বারাকপুরে। সেখানেই তাঁর শৈশব কেটেছে। নৈহাটির অন্য পারে সাগঞ্জ কেওটায় প্রসন্ন পণ্ডিতের পাঠশালায় তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়।

শিক্ষা ও কর্মজীবন

১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে বনগ্রাম উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে ভরতি হয়ে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর কলকাতায় এসে রিপন কলেজে ভরতি হন। সেখান থেকে ১৯১৬-তে আই এ, ১৯১৮-তে ডিস্টিংশন-সহ বিএ পাস করেন। চতুর্থ বার্ষিক শ্রেণিতে পড়ার সময়ই বিয়ে করেন বসিরহাট মহাকুমার পানিতর গ্রামের গৌরীদেবীকে। কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি যখন এম এ পড়ছেন ঠিক সেই সময়ে গৌরীদেবীর আকস্মিক মৃত্যু হয় ফলে ভগ্নোদ্যম হয়ে পড়াশোনা বন্ধ করে দিলেন। sahajbanglarachana.com

আরো পড়ুন-  ১২৫তম জন্মবর্ষে নেতাজী সুভাষচন্দ্র প্রবন্ধ রচনা PDF

এরপর ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথমে জঙ্গীপাড়া মাইনর স্কুলের শিক্ষক হন। কিন্তু পরের বছরই তা ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন। এরপর হরিনাভী স্কুলে শিক্ষকতার কাজ পেলেন। এই সময়েই তাঁর মাতৃবিয়োগ হয়। ১৯২২-এর জুলাই মাসে হরিনাভীর চাকরি ছেড়ে প্রথমে এক ব্যবসায়ীর কাছে পরে পাথুরেঘাটার জমিদার অক্ষয় ঘোষের জমিদারিতে কাজ করেন। জমিদার অক্ষয় ঘোষ তাঁকে ভাগলপুরের এস্টেটে সহকারী ম্যানেজার করে পাঠান। ১৯৩০-এ বিভূতিভূষণ ফিরে আসেন। খেলাত ঘোষ ইনস্টিটিউশনে শিক্ষকতার কাজ নেন। এই সময় বিয়ে করেন রমা দেবীকে। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে খেলাত ঘোষ ইনস্টিটিউশনের চাকরি ছেড়ে চলে আসেন স্বগ্রামে। সেখানেই গোপালনগরে হরিপদ ইনস্টিটিউশনে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৪৭-এ তাঁর একটি পুত্রসন্তান হয়।

সাহিত্যজীবন

তারাশঙ্কর ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়–বাংলা সাহিত্যের এই দুই দিকপাল কথা-সাহিত্যিকের সমকালীন হয়েও বিভূতিভূষণ ছিলেন এক স্বতন্ত্র মানসিকতার কথাশিল্পী। তাঁর সৃষ্টিতে সামাজিক সমস্যার তীব্রতা নেই, আছে সেই জীবনের কথা যা স্নেহ, অভিমান ও মানবিকবোধে আন্দোলিত। আছে সেই গার্হস্থ্য জীবনের ছবি যেখানে থাকে সুখ দুঃখ, আনন্দ-বেদনার ওঠানামা। বিভূতিভূষণ জীবনকে নিরীক্ষণ করেছেন এক প্রশান্ত, অধ্যাত্ম জীবনবোধ নিয়ে। তাঁর রচনায় নেই কোনো উপেক্ষিত, লাঞ্ছিত গোষ্ঠীজীবনের কথা, নেই শ্রেণিসংঘাত বা শ্রমিক-মালিকের সংকট, অথচ গভীর জীবনবোধ প্রকাশ পেয়েছে তাঁর প্রত্যেকটি রচনায়।

তাঁর উপন্যাস ও ছোটোগল্পের সংখ্যা কম নয়। গ্রন্থসংখ্যা পঞ্চাশের অধিক। ‘পথের পাঁচালী’ (১৯২৯) তাঁর প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত উপন্যাস। ‘পথের পাঁচালী’ ও ‘অপরাজিত’ বিভূতিভূষণের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। এ ছাড়াও ‘আরণ্যক’, ‘আদর্শ হিন্দুহোটেল’, ‘দেবযান’ ইত্যাদি প্রায় চোদ্দোটি উপন্যাস তিনি রচনা করেন। ‘মেঘমল্লার’, ‘মৌরীফুল’, বিধু মাস্টার ইত্যাদি প্রায় আঠারোটি গল্পগ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর লেখা ‘চাঁদের পাহাড়’, ‘মরণের ডঙ্কা বাজে’, ‘মিসমিদের কবচ’ ইত্যাদি শিশু-কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্কদের মনে নাড়া দেয়। এ ছাড়াও আছে দিনলিপি, ভ্রমণকাহিনি, বারোয়ারি উপন্যাস ও বিবিধ গ্রন্থ। ‘ইছামতী’ উপন্যাসের জন্য তিনি ‘রবীন্দ্র স্মৃতি পুরষ্কার’-এ সম্মানিত হয়েছিলেন। sahajbanglarachana.com

আরো পড়ুন-  সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় প্রবন্ধ রচনা PDF

প্রকৃতি প্রেমী সাহিত্যিক

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বিশ্ববাণীকে উপলব্ধি করেছিলেন প্রকৃতির মধ্যেই। তাঁর উপন্যাসের পটভূমি পল্লীবাংলার গ্রামাঞ্চল এবং শহর জুড়ে বিস্তৃত। ‘পথের পাঁচালী’র গ্রাম্য চিত্রগুলি সবই তাঁর স্ব-গ্রামের। সেখানে পাখিডাকা গ্রাম্য সন্ধ্যায় বা দুপুরে এক মুগ্ধমতি গ্রাম্যবালক অপুর চোখ দিয়ে তিনি প্রকৃতিকে নিপুণভাবে তুলে এনেছেন। দুর্গার সাহচর্যে এবং নেতৃত্বে অরণ্য প্রকৃতির নির্জনতা, শরবন, বুনোফল, অকিঞ্চিৎকর লতাগুল্ম, তুচ্ছ ফলমূল আহরণ, কাশবনের আড়াল থেকে ট্রেন দেখা অপুর জীবনে বিশ্বপ্রকৃতির রহস্য জিজ্ঞাসার দরজা খুলে দিয়েছে।

‘আরণ্যক’ উপন্যাসের সত্যচরণ অরণ্যমেধ অনুষ্ঠানে যন্ত্রণায় কাতর হয়ে অরণ্যের বিগত সৌন্দর্যের স্মৃতিচারণায় সান্ত্বনা পেতে চলেছে। বিভূতিভূষণের বিভিন্ন রচনায় উঠে এসেছে গ্রাম, বাঁশের বন, ইছামতীর পাড়, কচি কচি সবুজ পুঁই গাছের সুস্পষ্ট ডগ, পদ্মফুলে ভরা মধুখালির চিল, বেত্রাবতীর খেয়া, দুর্ভিক্ষের কালো ছায়া। প্রকৃতির মধ্যে তিনি যেন অনুভব করতে পেরেছিলেন এক সৌন্দর্যময় সুস্পষ্ট বাণী। অন্তরে ও বাইরের রেখায় মিল। তাঁর সৃষ্ট ‘অপু’ চরিত্রের মধ্যে যেন বিভূতিভূষণকে খুঁজে পাওয়া যায়। ভ্রমণ, কর্মক্ষেত্র ও বসবাসের সূত্রে তিনি গ্রামবাংলার প্রকৃতি ও মানুষকে যেভাবে জেনেছিলেন তাকেই আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে তুলে ধরেছেন পাঠকের সামনে। প্রকৃতির মধ্যেই যে সব পেয়েছির জগৎটি আছে তাকেই তিনি উপলব্ধি তরে ভাষারূপ দিয়েছেন, যা পাঠকের মনে নতুন অনুভূতি জাগায়।

শেষকথা

১৯৫০-এর ১ নভেম্বর, (১৫ কার্তিক, ১৩৫৭ সন) মাত্র ৫৬ বছর বয়সে ঘাটশিলার বাড়িতে বিভূতিভূষণ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলা সাহিত্য ও বাঙালি পাঠকের কাছে যা এক অপূরণীয় ক্ষতি বলেই মনে করা হয়। তাঁর পরিকল্পিত ‘কাজল’ উপন্যাসটি সমাপ্ত করেন বিভূতিভূষণ পুত্র তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। sahajbanglarachana.com


ভালো লাগলে শেয়ার করো

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!